Uncategorized

রিচ ড্যাড পুওর ড্যাড রিভিউ: বইটি কেন আপনার পড়া উচিত

রিচ ড্যাড পুওর ড্যাড রিভিউ: বইটি কেন আপনার পড়া উচিত

রবার্ট কিয়োসাকির লেখা 'রিচ ড্যাড পুওর ড্যাড' ব্যক্তিগত অর্থায়নের জগতে একটি অত্যন্ত প্রভাবশালী বই। ১৯৯৭ সালে প্রথম প্রকাশের পর থেকে এই বইটি কোটি কোটি মানুষের জীবনের আর্থিক দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দিয়েছে। আপনি যদি নিজের আর্থিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে চান, তবে বইটি কেন এবং কীভাবে পড়া উচিত, তা এই রিভিউতে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো।

রিচ ড্যাড পুওর ড্যাড রিভিউ: মূল বিষয়বস্তু

রিচ ড্যাড পুওর ড্যাড মূলত রবার্ট কিয়োসাকির নিজের জীবনের দুই ধরনের বাবার অভিজ্ঞতার গল্প। একজন তার জৈবিক বাবা, যিনি শিক্ষিত কিন্তু সর্বদা আর্থিক সংকটে ভুগতেন (তিনিই 'পুওর ড্যাড')। অন্যজন হলেন তার বন্ধুর বাবা, যিনি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় খুব একটা দক্ষ না হলেও ব্যবসায়িক বুদ্ধিতে ধনী ছিলেন (তিনি 'রিচ ড্যাড')। লেখক দেখিয়েছেন কীভাবে ধনীরা অর্থের জন্য কাজ করে না, বরং অর্থকে তাদের জন্য কাজ করাতে শিখিয়ে নেয়।

বইটির মূল ভিত্তি হলো আর্থিক সাক্ষরতা। আজকের পৃথিবীতে সাধারণ স্কুলগুলোতে আমাদের শেখানো হয় কীভাবে ভালো চাকরি পেতে হয়, কিন্তু কেউ শেখায় না কীভাবে অর্থ পরিচালনা করতে হয় বা কীভাবে বিনিয়োগ করতে হয়। এই বইটিতে সেই অভাবটি পূরণ করার চেষ্টা করা হয়েছে।

বিষয়বস্তু পুওর ড্যাডের দর্শন রিচ ড্যাডের দর্শন
কাজের ধরণ অর্থের জন্য কাজ করা অর্থকে নিজের জন্য খাটানো
ঝুঁকি ঝুঁকি এড়িয়ে চলা ঝুঁকি বুঝে নিয়ন্ত্রণ করা
শেখা ভালো চাকরির জন্য পড়াশোনা সম্পদ তৈরির দক্ষতা অর্জন
দৃষ্টিভঙ্গি "আমি এটা কিনতে পারবো না" "আমি কীভাবে এটা কিনতে পারি?"

কেন বইটি এখনো প্রাসঙ্গিক?

বইটি কয়েক দশক আগে লেখা হলেও এর মূল বার্তাগুলো বর্তমানে সমানভাবে কার্যকর। বর্তমান যুগে যখন জীবনযাত্রার খরচ বাড়ছে এবং মুদ্রাস্ফীতির হার ঊর্ধ্বমুখী, তখন কেবল বেতনের ওপর নির্ভরশীল থাকা ঝুঁকিপূর্ণ। কিয়োসাকি এখানে 'অ্যাসেট' বা সম্পদ এবং 'লায়াবিলিটি' বা দায়ের মধ্যে পার্থক্য স্পষ্ট করেছেন। তিনি বারবার বলেছেন, যা আপনার পকেটে টাকা আনে তা সম্পদ, আর যা আপনার পকেট থেকে টাকা বের করে নেয় তা দায়।

অনেকেই মনে করেন, বেশি আয় মানেই বেশি সম্পদ। কিয়োসাকি এই ধারণাকে ভুল প্রমাণ করেছেন। তিনি বলেছেন, আপনি কত আয় করছেন তার চেয়ে বেশি জরুরি হলো আপনি কত টাকা ধরে রাখতে পারছেন এবং সেই টাকা কীভাবে কাজে লাগাচ্ছেন। বড়দের জীবনের অভ্যাস গড়ে তোলার মতো এটিও একটি দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়ার অংশ।

রবার্ট কিয়োসাকির ৬টি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা

বইটিতে কিয়োসাকি ধনী হওয়ার ছয়টি মৌলিক পাঠ দিয়েছেন। এই পাঠগুলো বুঝতে পারলে যে কেউ তার আর্থিক জীবনে আমূল পরিবর্তন আনতে পারবে।

১. ধনীরা অর্থের জন্য কাজ করে না: সাধারণ মানুষ অর্থের পেছনে ছোটে, কিন্তু ধনীরা অর্থকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আনে। তারা এমন সিস্টেম তৈরি করে যেখানে কাজ না করলেও অর্থ আসতে থাকে।

২. আর্থিক সাক্ষরতা অর্জন: হিসাববিজ্ঞান, বিনিয়োগ, বাজার এবং আইন, এই চারটি বিষয়ে জ্ঞান না থাকলে সম্পদ গড়া সম্ভব নয়। বিনিয়োগের প্রাথমিক ধাপ বুঝতে চাইলে এই শিক্ষাগুলো এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই।

৩. নিজের ব্যবসার দিকে নজর দিন: চাকরির পাশাপাশি নিজের সম্পদের ভিত্তি তৈরির দিকে মনোযোগ দেওয়া জরুরি। চাকরি আপনার বেঁচে থাকার রসদ জোগাবে, কিন্তু সম্পদ আপনাকে স্বাধীনতা দেবে।

৪. কর্পোরেশনের শক্তি: ধনীরা কর ব্যবস্থার সুবিধা নেওয়ার জন্য ব্যবসা এবং কর্পোরেশন ব্যবহার করে, যা একজন সাধারণ চাকুরিজীবীর পক্ষে সম্ভব হয় না।

৫. নতুন টাকা উদ্ভাবন: কিয়োসাকির মতে, অর্থ কেবল কাগজে ছাপা কোনো বিষয় নয়। এটি একটি আইডিয়া। আপনি যত বেশি উদ্ভাবনী হবেন, তত বেশি টাকা আকর্ষণ করবেন।

৬. শেখার জন্য কাজ করুন, অর্থের জন্য নয়: আপনার প্রথম লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন সব দক্ষতা শেখা যা ভবিষ্যতে সম্পদ গড়তে সাহায্য করবে। সফল মানুষদের সকালের রুটিন এবং কাজের ধরণ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তারা শেখাকেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়।

সম্পদ ও দায়ের আসল পার্থক্য

অনেকে গাড়ি বা দামী আসবাবপত্রকে সম্পদ মনে করেন। কিয়োসাকির মতে, যদি কোনো জিনিস আপনার পকেট থেকে প্রতি মাসে টাকা বের করে নেয়, তবে তা সম্পদ নয়। সম্পদ হলো এমন কিছু যা আপনার জন্য প্যাসিভ ইনকাম বা নিষ্ক্রিয় আয় তৈরি করে। যেমন, বাড়ি ভাড়া, ব্যবসার লভ্যাংশ বা রয়্যালটি। অল্প বয়সে আর্থিক স্বাধীনতা অর্জনের জন্য এই পার্থক্য বোঝাটা সবচেয়ে জরুরি।

রিচ ড্যাড পুওর ড্যাড নিয়ে সাধারণ ভুল ধারণা

অনেকে মনে করেন এই বইটি পড়লেই রাতারাতি ধনী হওয়া যাবে। এটি একদমই ভুল ধারণা। কিয়োসাকি কোথাও বলেননি যে শর্টকাট ব্যবহার করে ধনী হওয়া সম্ভব। বরং তিনি দীর্ঘমেয়াদী ধৈর্যের কথা বলেছেন। কাজের প্রতি মনোযোগ বা ফোকাস বজায় রেখে ধারাবাহিক প্রচেষ্টার কোনো বিকল্প নেই।

অন্য একটি ভুল ধারণা হলো, অনেকে মনে করেন চাকরি করা অপরাধ। লেখক এখানে চাকরি বা ব্যবসা, কোনোটিরই বিরোধিতা করেননি। তিনি কেবল বলতে চেয়েছেন, কেবল চাকরির ওপর নির্ভরশীল না থেকে বিকল্প আয়ের উৎস তৈরি করা একজন সচেতন নাগরিকের দায়িত্ব।

বইটি পড়ার সময় যা মনে রাখা জরুরি

১. তাত্ত্বিক বনাম ব্যবহারিক: বইটি পড়ার পর সব নিয়ম হুবহু নিজের জীবনে প্রয়োগ করার আগে নিজের অর্থনৈতিক অবস্থা বিবেচনা করুন।

২. সংস্কৃতি ও দেশ: আমেরিকার বাজার আর বাংলাদেশের বাজার এক নয়। তাই বইয়ের উদাহরণগুলো গ্রহণ করার সময় নিজের দেশের পরিস্থিতি (যেমন ব্যাংকিং সিস্টেম বা রিয়েল এস্টেট আইন) মাথায় রাখুন।

৩. প্রয়োজনীয় জ্ঞান: বইটি পড়ার আগে সাধারণ আর্থিক হিসাব সম্পর্কে কিছুটা ধারণা রাখা ভালো। শুরুতেই শেখার মানসিকতা থাকলে এই বই থেকে সবচেয়ে বেশি লাভবান হওয়া সম্ভব।

এই বইটির সীমাবদ্ধতা কী?

সব লেখকের লেখায় কিছু না কিছু বিতর্ক থাকে। কিয়োসাকির ক্ষেত্রেও তাই। অনেকে সমালোচনা করেন যে তিনি খুব বেশি আত্মপ্রচার করেন এবং নিজের কোম্পানির কোর্স বা গেম বিক্রির চেষ্টা করেন। এছাড়া তার দেওয়া অনেক উদাহরণ অতি সরলীকৃত। বাস্তব জীবনে বিনিয়োগ করা বইয়ের পাতায় লেখার মতো এত সহজ নয়। অর্থনৈতিক ঝুঁকি বা বাজার অস্থিরতার মতো বিষয়গুলো এখানে সেভাবে আলোচিত হয়নি। তাই অন্ধভাবে বইয়ের সব কথা অনুসরণ না করে নিজের বিচারবুদ্ধি ব্যবহার করা বাঞ্ছনীয়।

প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)

১. রিচ ড্যাড পুওর ড্যাড বইটি কি নতুনদের জন্য উপযুক্ত?

হ্যাঁ, ব্যক্তিগত অর্থায়নের বিষয়ে যারা নতুন, তাদের জন্য এই বইটি একটি চমৎকার সূচনা হতে পারে। এটি আপনার চিন্তাধারার মোড় ঘুরিয়ে দিতে সক্ষম।

২. বইটি পড়ে কি সত্যিই ধনী হওয়া সম্ভব?

বইটি আপনাকে ধনী হওয়ার একটি মানসিক কাঠামো দেবে। কিন্তু ধনী হওয়ার জন্য কেবল পড়া যথেষ্ট নয়, সেই অনুযায়ী কাজ করা এবং সঠিক বিনিয়োগ করা অপরিহার্য।

৩. বইটির কোন শিক্ষাটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ?

সম্পদ এবং দায়ের পার্থক্য বুঝতে পারা, এই শিক্ষাটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এটি আপনার খরচের ধরণ বদলে দেবে।

৪. বইটির কি কোনো বাংলা সংস্করণ আছে?

হ্যাঁ, বর্তমানে বাজারে এই বইটির অনেকগুলো বাংলা অনুবাদ সংস্করণ পাওয়া যায়। আপনি চাইলে মূল ইংরেজিটিও পড়তে পারেন, কারণ সহজ ইংরেজিতেই বইটি লেখা।

৫. বইটিতে কি কোনো বিনিয়োগ টিপস আছে?

এটি কোনো বিনিয়োগ টিপস দেওয়ার গাইডবুক নয়, বরং এটি একটি মাইন্ডসেট বা মানসিকতার বই। এটি আপনাকে বিনিয়োগ করার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত করে।

শেষ কথা

রিচ ড্যাড পুওর ড্যাড বইটি কেবল একটি বই নয়, এটি একটি পথনির্দেশিকা। আপনি যদি আপনার আর্থিক ভবিষ্যতের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নিতে চান, তবে এই বইটি অবশ্যই পড়ার তালিকায় রাখা উচিত। তবে মনে রাখবেন, সফলতা আসে পড়ার পর অনুশীলনের মাধ্যমে। বই থেকে শিক্ষাগুলো নিন, কিন্তু নিজের জীবনের প্রয়োজনে সেগুলোকে নিজের মতো করে সাজিয়ে নিন। ধারাবাহিকতা এবং সঠিক সিদ্ধান্তই আপনাকে প্রকৃত আর্থিক সাফল্যের দিকে এগিয়ে নেবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *